পাহাড়ি কন্যা
– জয়শ্রী কর
খুকুর বয়স বছর বারো মল বাজে তাঁর পায়ে
কাজলকালো চুলের গোছা ছেঁড়া কামিজ গায়ে।
বিকেল ফুরোয় সূর্য ডোবে, পাহাড়চূড়ায় বসে
আকাশপানে তাকিয়ে থাকে কখন তারা খসে।
ঘনিয়ে আসে আঁধার কালো এখন সে তো একা
হিসহিসানি শব্দ শোনে, যায় না কিছু দেখা।
একটু দূরে অন্য চূড়ায় আলোর রেখা ফোটে
সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলছে দেখে মনটা নেচে ওঠে।
ধীরে ধীরে শীর্ষ থেকে নামল পাদদেশে
বাসার দিকে এগিয়ে চলে পাহাড়-গাটি ঘেঁষে।
রাত্রিটুকু ফুরিয়ে যেতেই ওঠে আবার চূড়ে
রংবেরঙের কত পাথর সারা পাহাড়জুড়ে।
পাথর নিয়ে টিলার কোলে করছে নাড়াচাড়া
কুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ছে নীচে হাসে পেলেই সাড়া।
গুনগুনিয়ে আপন-মনে গাইছে ক্ষণে ক্ষণে
খেলার সাথি পাবে কোথা, তাইতো ঘোরে বনে।
পাহাড়-চূড়ে হিমেল হাওয়া বইছে ফুরুফুরু
ওপর থেকে ঝরনাধারা নামছে ঝুরুঝুরু।
হঠাৎ কীসের শব্দ শুনে জাগলো মনে ভীতি
পাথরে কান লাগিয়ে শোনে আসছে ভেসে গীতি।
খানিক দূরে দাঁড়িয়ে বাবা নামছে তাড়াতাড়ি
হাতটি নেড়ে বলল ওকে, ফিরব এবার বাড়ি।
টিলার গায়ে হাত বুলিয়ে স্নেহ আদর করে
বুকের ভিতর জমাট ব্যথা নয়নে জল ঝরে।
মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি
– জয়শ্রী কর
মা-মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি
এমন কিছু নেইকো খাঁটি
যেমন মা ও দেশের মাটি।
দাপাই সারাজীবন ধরে
দুইয়ের কোলই শীতলপাটি।
মানুষ করার জন্য লড়াই
করে না মা আদৌ বড়াই।
কড়া নজর সবার দিকে
আঁকাবাঁকা রাস্তা চড়াই।
হতেই হবে যুদ্ধে জয়ী
মা বুঝে নেয় কে প্রত্যয়ী।
হাল ছাড়ে না মাতা কভু
জন্মদাত্রী স্নেহময়ী।
মা’র হাসিমুখ ফুলের মতো
মন ভরে না দেখি যতো।
মা তো সবার প্রথম গুরু
দুচোখ জুড়ে স্বপ্ন কতো।
কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটাবে
স্তন্য দিয়ে পেট ভরাবে।
হাজার দস্যিপনা সহে
এমন রত্ন কোথায় পাবে।
লাজুক লতা
– জয়শ্রী কর
লাজুক লতা লজ্জাবতী
বুঝি না তোর মতিগতি
দিনেও কেন ছোঁয়া পেলে ঝিমিয়ে পড়িস?
মূর্ছা লাগে ফুলের ঘায়ে
ব্যথা লাগে কোমল গায়ে
আবার তো তুই ক্ষণেক পরে জেগে উঠিস।
দেখ ওদিকে ওইতো কাছে
শিরীষ কেমন দাঁড়িয়ে আছে
পাতায় ফুলে জমে আছে স্নেহের পরশ,
ভোরে পাখির কুহু তানে
খুশির খবর আসে কানে
ছলকে ওঠে তখন ওদের কত হরষ।
একটু ছুঁলে ঝিমোস কেন
নতুন আসা বউড়ি যেন
নয়ন মেলে থাকনা রে তুই খুশি মনে,
ঝলমলিয়ে পড়ছে আলো
বেগুনি ফুল দেখতে ভালো
ফুলের শোভা ছড়িয়ে পড়ে এই ভুবনে।
শিরীষ দু’চোখ বন্ধ করে
ঘুমায় রাতে ওঠে ভোরে
সোনালি রোদ গায়ে মেখে কেমন দোলে,
গ্রীষ্মকালে গাছের তলায়
শীতল বাতাস সন্ধ্যাবেলায়
শুকনো পাতা ঝরে পড়ে ধরার কোলে।
কে সাজাল এমন করে
– জয়শ্রী কর
জাগলি কখন ডাকলি না তো
কে পরাল শাড়ি?
মানিয়েছে দারুণ তোকে
কে বলে আনাড়ি।
রাতে যখন দেখি তোকে
তখন ছিলি কুঁড়ি
বাদামি রং একটু ছিল
করল কে তা চুরি?
মাখলি কি তুই নিজে নিজে
মুখে গলায় পেটে
সাতসকালে এত হলুদ
কে দিল রে বেটে?
এলামাণ্ডা মেজাজ ঠান্ডা
আমার কথায় হাসে
ও’ তো ভালো করেই জানে
সবাই ভালবাসে।
প্রকৃতির হাতছানি
– জয়শ্রী কর
পাহাড় নদী ডাকে আমায়, ডাকে পাইন সারি
ঝলমলে ওই পাহাড়শ্রেণির দৃশ্য মনোহারী।
পাদদেশে গাছগাছালি রঙিন ফুলের মেলা
মেঘবালিকার সাথে রবির নিত্য চলে খেলা।
চূড়ায় চূড়ায় ছড়িয়ে আছে মুক্তাদানার হাসি
বরফ-রোদে মাখামাখি আনন্দ একরাশি।
আলোর স্পর্শে অপূর্ব রূপ ধীরগতিতে নদী
যেতে যেতে মনের কথা শোনায় নিরবধি।
নীল নয়না কুলুকুলু ডাকছে বারেবারে
মায়া-মাখা শুভ্র ফেণা আমার নজর কাড়ে।
পা চলে না দাঁড়িয়ে পড়ি দেখি দুচোখ ভরে
গুছিয়ে রাখি মানসপটে নিরালা প্রান্তরে।
রৌদ্রতাপে ঠিকরে পড়ে অপূর্ব এক দ্যুতি
কোথাও আমি পাই না খুঁজে একটুও বিচ্যুতি।
ফাঁদ
– জয়শ্রী কর
ফাঁদে যখন আটকা পড়ে তখন সবার বুদ্ধি খোলে
মায়ের রাঙা চরণতলে নতশিরে পড়বে ঢলে।
বেরোবার পথ পায় না খুঁজে
পড়েই থাকে মুখটি গুজে
বাহির হবে কেমন করে আতঙ্ক তো ধরার কোলে।
ধরিত্রীমা’র রুষ্ট খুবই মানবজাতির অত্যাচারে
এসব কথা বলবে কারে ডুবছে ওরা অন্ধকারে।
কোলে সবাই যাচ্ছে নেচে
সহিষ্ণুতার বাঁধ ভেঙেছে
বুদ্ধিহীনের মতো ওরা নিজের পায়ে কুড়ুল মারে।
কবি পরিচিতি

জয়শ্রী কর। জন্ম জুন ২, ১৯৫৬তে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় কোলাঘাট থানার অন্তর্গত চিমুটিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে। মাতা কমলাবালা, পিতা রামপদ মাইতি।
কোদালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার প্রথম পাঠ। ১৯৭৪ এ ভোগপুর কেনারাম মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর পাঁশকুড়া বনমালী কলেজে স্নাতক স্তরে কলা বিভাগে ভর্তি হন। পড়া চলাকালীন ১৯৭৬ এ ডক্টর অজিত কুমারের সঙ্গে শুভ পরিণয়। কৈশোর থেকেই খেলাধুলা, সেলাই ও শরীরচর্চার সঙ্গে তিনি যুক্ত। পরে গিটার, তবলা, যোগ ব্যায়াম এবং কাব্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। নিজে একজন সংগীত শিল্পী ও সুরকারও বটে – বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশন করে থাকেন।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘নীল আকাশের কোলে’ পাঠকমহলে খুবই সমাদৃত। রাজ্য সরকারের তরফে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরীর ফাউন্ডেশন এবং বঙ্গীয় প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা সভার যৌথ উদ্যোগে তার বই কেনা হয় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গ্রন্থাগারগুলির জন্য। এছাড়া আরো দুটি কাব্যগ্রন্থ – ‘ভোরের বাঁশি’ এবং মায়াডোর’ – প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যে। প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার কবিতা রচনার প্রেরণা। প্রতিদিন কবিতা লেখা, কাব্য আলোচনা আর গানবাজনা নিয়ে এখন দিন কাটছে।