পারমিতা ব্যানার্জি – কবিতাগুচ্ছ (অপেক্ষার উৎস, সত্যি হোক, অন্বেষণে, এ জীবন চলে মোহনার খোঁজে, জীবন তরী এবং মহামারী)

অপেক্ষার উৎস

– পারমিতা ব্যানার্জি

হঠাৎ যদি তুমি চলে আসো আবার __
আমার যাত্রা পথে পথ আগলে দাঁড়াও!!
শুভ যাত্রা কী থামানো যায়?
কী জানি তোমার ফিরে আসাটাই হয়ত শুভ!

যখন হিম ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছিলাম…
জানো কী সেসব কথা!
তুমি কী সেই ঝড়!
ঝড় রাস্তা বোঝে না। ঢুকে পড়ে
পাহাড়ের খানাখন্দে __
কী তীব্রতায় দিশেহারা তখন!
হিমশলাকা বিঁধছিল চোখে।
হয়তো তুমিই সেই হিম শলাকা!
বন্ধ করতে চাই চোখ। পারি না।
ভয় করে যদি পথ হারাই!
এক পাশে পাহাড়ের দেয়াল।
অন্য পাশে গভীর খাদ…
পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত…
আমি জানি তুমি নিশ্চয়ই খাদ নও।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে তোমায় খুঁজি।
তুমি মৃত্যু নও। হতে পারো না।
পৌঁছে যাই ভুজবাসায়।
ওখানে ভূর্জ গাছের বাকল খসে পড়ে।
শনশন হাওয়ায় নড়াচড়া করে ভূর্জ পত্র –খসখস…
তুমি কী দাঁড়িয়ে ওখানে?
বুঝতে পারি না।
তখন শুধু লক্ষ্য পবিত্র গঙ্গার তিরতিরে উৎস।
হাঁটছি আর হাঁটছি…কত দূর!
সূর্যের আলো
নানা রঙের গ্লেসিয়ারে ঠিকরে পড়ে।
চোখ ধাঁধায়…
আবার কী অন্ধ হয়ে যাবো?
যেমন হয়েছিলাম সেই দিন!
যেদিন এসে দাঁড়িয়েছিলে মুখোমুখি। ক্ষণকাল…
কী তীব্র সেই তেজ!!

তুমি কী আবার এসেছো ফিরে!
হাত ধরে বলবে এখুনি __
“এসো, চলো… পৌঁছে যাই
উৎসমুখে…”

সত্যি হোক

– পারমিতা ব্যানার্জি

শ্যাওলা বুকে ফড়িং নাচে
পদ্ম দীঘির কোলে ।
সাঁঝ বেলাতে শুকনো ডালে
শ্যামলা ফিঙে ঝোলে।
দৃশ্যটি বেশ কাব্য কথার বোলে!

পিদিম হাতে গাঁয়ের বধূ
তুলসীতলায় যায়।
হাওয়ার তালে দীপের কাঁপন
হাতটি সামলায়।
আহা, বধূর মুখটি রাঙা হয়।।

কোকিল ডিমে কাকটি ভুলে
দিচ্ছে যখন তা’,
আদর ছেড়ে কাকটি তারে
বলছে কী যা তা?
এই তো পরম স্নেহের বারতা!

আকাশ নীলে সূর্য এসে
দেখছে ভেসে ভেসে…
চাষের মাঠে ধানের শীষে
শিশির বিন্দু হাসে!
কৃষক মজুর থাক্ অন্ন সুবাসে।

চাষী-বৌ নিকোয় উঠোন
নবাণ্ণের উৎসবে ।
এমন ছবিই সত্যি থাকুক,
কবি বসে ভাবে।
দারিদ্র মুছে সুখে বাঁচুক সবে।

অন্বেষণে

– পারমিতা ব্যানার্জি

জীবনের পর জীবন হেঁটে
খুঁজেছি সেই প্রেম…
তুই বলেছিলি ভরিয়ে দিবি
আমার অপূর্ণতা।
কাঁটা ঝোপ ঘেঁটে
ক্ষত বিক্ষত হয়ে
বিষাক্ত হয়েছিস তুই!
আমার জন্য…
হয়ত শুধু আমারই জন্য!
ভুলেছিস দিগন্তের পথ।
দেখেও দেখিসনি
কত পথ পড়ে আছে
জোছনায়!
সবুজে হেঁটেছি কত দুপুর!
একসাথে ভিজেছি
ঝর্ণার ঝাপটায়।
পৌঁছতে পারিনি
সেই উপত্যকা মনে,
পাইনি কোথাও সেই প্রেম!
আরো কত শতাব্দী
হাঁটবো আমরা কে জানে!

এ জীবন চলে মোহনার খোঁজে

– পারমিতা ব্যানার্জি

একদিন _
জীর্ণ পাতার দেশে
বকুল খুঁজেছি যখন
নবপল্লবে আসেনি প্রাণ…
চঞ্চল হয়নি বাতাস _
লেখাও হয়নি
মোহনার কোনো গান।
হতবুদ্ধি
নাবিকের দাঁড়
রচনা করেনি কাব্য…
খোঁপা সৃজনে যে হয়েছি
জেরবার!!!

জীবন তরী এবং মহামারী

– পারমিতা ব্যানার্জি

​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ (১) জীবন তরী​

​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ গেয়ে​
​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ যাও গান​
​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ পালটি তুলে দিয়ে ​
​ ​ ​ পথ বাওয়া খেলার এ তরী​
​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ নিয়ে!​


​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ (২) ​ মহামারী​

​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ শুধু​
​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ক’টা প্রাণ​
​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ রেখে সবই ধূধূ, ​
​ ​ ​ ​ মারীর রাতে একা যে রয় ​
​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ ​ বিধু!

(সিনকোয়াইন ছন্দে লেখা)


কবি পরিচিতি

পারমিতা ব্যানার্জি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পিতা স্বর্গীয় দাশরথি দাস, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মাতা স্বর্গীয় মণিকা দাস গৃহবধূ ছিলেন। ছয় ভাই বোনের মধ্যে আমি চতুর্থ। বর্তমানে আমি আমার জীবন সাথী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রী তমাল ব্যানার্জি, একমাত্র পুত্র পরন্তপ ও পুত্রবধু পৃথা সহ শ্বশুরালয়ে থাকি।

ছোটবেলায় বাবার অনুপ্রেরণায় ও মায়ের সাহচর্যে লেখালেখি, আবৃত্তি ও ছবি আঁকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে সংসারে জড়িয়ে পড়ে ছেদ পড়ে লেখায়। কুড়ি বাইশ বছর পর পুত্র পরন্তপের উৎসাহে নতুন করে কলম ধরা এবং বাংলা কবিতা ডটকমে যুক্ত হওয়া। এখানেই আমি নতুন করে খুঁজে পাই জীবন। এই কবিতার জগতে এখন চলছি এবং চলছি।