নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া
– হারুন-অর-রশীদ খান

বেগম রোকেয়া এমন এক অসামান্য নারী, যিনি এ দেশের অবহেলিত নারী সমাজকে এক অভাবনীয় আলোকবতির্কার সন্ধান দিয়েছেন। নারী জাগরণ তথা নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া এক প্রদীপ্ত শিখা। যার সংস্পর্শে এসে এই উপমহাদেশের নারী সমাজ লাভ করেছে মুক্তির দিশা। তিনিই প্রথম বাঙালি নারী, যিনি নারী হয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, এই উপমহাদেশে নারী সমাজের মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে শিক্ষা ও স্বনিভর্রতা। বেগম রোকেয়ার কৃতিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতোই। তিনি শুধু স্কুল প্রতিষ্ঠা কিংবা নারী শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং সে সঙ্গে ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সমাজে নারীদের অবস্থার সাবির্ক উন্নতির জন্য তিনি অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সমকালীন সামাজিক অনুশাসনের অচলায়তন ভাঙা; বিদ্যাসাগরের চেয়েও বেগম রোকেয়ার জন্য ছিল অত্যন্ত দুরুহ। তারপরও তিনি বিরামহীন কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তিনিই প্রথম নারীদের সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কথা ভেবেছিলেন। নারীর কাঙ্খিত মুক্তি সাধনে ও নারী শিক্ষায় উদ্দীপ্ত প্রাণ বেগম রোকেয়া তাই চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন তার আপন কীর্তি ও সৎকমের্র জন্য।
বেগম রোকেয়া ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তগর্ত ‘পায়রাবন্দে’ বিখ্যাত জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রোপিতামহ- পায়রাবন্দের প্রথম জমিদার টাটি শেখ বলদিয়া ইংরেজদের আনুকুল্যে শেখ থেকে চৌধুরী হন। পিতামহ: জমির উদ্দিন চৌধুরী, পিতা- জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী সাবের চৌধুরী ও মাতা রাহাতুন্নেছা সাবেরা চৌধুরানী। তার মাতা রাহাতুন্নেছা সাবেরা চৌধুরানী ঢাকার বলিয়াদির জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরী সাহেবের কন্যা ছিলেন। বড় বোন করিমন নেসা ও বড় ভাই ইব্রাহিম সাবেরের কাছেই শৈশবকালে বেগম রোকেয়ার লেখাপড়ার হাতে খড়ি। তাদের ঐতিহ্যবাহী এই সাবের পরিবারে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার প্রচলন ছিল কিন্তু বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রচলন ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। রোকেয়ার দুই সহোদর ভাই, ইব্রাহিম সাবের ও খলিলুর রহমান সাবের সবর্প্রথম সাবের পরিবারের ঐতিহ্য ভেঙে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৮৯৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভাগলপুর নিবাসী খানবাহাদুর সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বিপত্নীক সাখাওয়াৎ হোসেনের শিক্ষা, ভদ্রতা ও অন্যান্য গুণ বিচারে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর অনুপ্রেরণা আর সাহায্যে জীবনের এই অধ্যায়ে রোকেয়া ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং পড়তে শুরু করেন দেশি-বিদেশি ইংরেজি বই ও পত্রিকা। স্বামীর সাহচর্যে রোকেয়ায় শিক্ষা অর্জন ভালোই চলছিল। কিন্তু ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়ে সাখাওয়াত হোসেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কলকাতায় এনে চিকিত্সা ও রোকেয়ার প্রাণপন সেবা ব্যর্থ করে ১৯০৯ সালে ৩রা মে ৩০ ইউরোপীয়ান অ্যাসাইলাম লেনের বাড়িতে সাখাওয়াতের জীবনাবসান হয়। মাত্র ২৮ বছর বয়সে বেগম রোকেয়া তার স্বামীকে হারান। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু বেগম রোকেয়াকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। তার ১০ বছরের দাম্পত্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
রোকেয়ার মনোবল ছিল অপরিসীম। তাই তিনি এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ শাহ মালেক আব্দুলের সরকারি বাসভবন গোলকুঠির বারান্দায় পাটি বিছিয়ে স্বামীর নামানুসারে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের যাত্রা শুরু হয়। সম্বল একখানা বেঞ্চের মাত্র পাঁচজন ছাত্রী, তার মধ্যে ছিলো আব্দুল মালেকেরই চার কন্যা। সেই অবস্থায় মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা ছিল এক দুঃসাধ্য সাধন করা। আর সেই সাহসিকতার জন্যে রোকেয়াকে নিজের আত্মীয় ও সমাজের চক্ষুশূল হতেও হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর মাত্র ২ বছর পরেই ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ৩ ডিসেম্বর; স্বামীর সঞ্চিত ১০,০০০/- (দশ হাজার) টাকা নিয়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। তখন নির্ভরযোগ্য আপনজন বলতে কেউ ছিলো না তার। কিন্তু মনে ছিলো বিশ্বাস। ৩০ বছর বয়সী রোকেয়া কলকাতায় এসেই হাত দেন নিজের অসম্পূর্ণ কাজে।
এরপর ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ শনিবার; কলকাতার তালতলা অঞ্চলে ১৩নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের ভাড়াবাড়িতে মাত্র দুটি ক্লাস, দুখানা বেঞ্চ আর ৮ জন ছাত্রী নিয়ে স্কুলের যাত্রা শুরু করেছিলেন। রোকেয়া স্কুলের প্রথম ক্লাস করলেন। স্কুলের শিক্ষিকা মাত্র একজন, রোকেয়া নিজেই। তার না ছিল কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, না ছিলো বাড়ির বাইরে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা। কেবল মনোবল আর ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে তিনি দাঁড় করিয়ে ফেলেন সমাজের অন্ধকার সময়ে এরকম এক আলোর প্রতিষ্ঠান। স্কুল পরিচালনার জন্যও অভিজ্ঞতার দরকার, রোকেয়া সমাজের প্রভাবশালী মহিলাদের সাহায্যে কলকাতা বেথুন, গোখেল মেমোরিয়াল প্রভৃতি মেয়েদের স্কুলে নিয়মিত যাতায়াত করা শুরু করলেন, শিক্ষকদের পড়ানোর ধরন, স্কুল পরিচালনার পদ্ধতি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে থাকেন।
“শিক্ষার অর্থ কোনো সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষের অন্ধ অনুকরণ নহে। ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা দিয়াছেন, সেই ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা। আমি কেবলমাত্র ‘পাশ করা বিদ্যা’কে প্রকৃত শিক্ষা বলি না।” – বেগম রোকেয়া
১৪ নং রয়েড স্ট্রিটের ব্যারিস্টার আব্দুর রসুলের বাড়িতে স্কুলের পরিচালনা কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে মৌলভী সৈয়দ আহমদ আলীকে কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হয়। মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে, অভিভাবকদের বুঝিয়ে, নিজের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরেও বাঙালিদের মধ্যে প্রথমদিকে নারী শিক্ষার জন্য তেমন সাড়া ফেলতে পারলেন না রোকেয়া। তাই স্কুলের শিক্ষার মাধ্যম উর্দুই রাখতে হলো। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের সকল ছাত্রীই লেখাপড়া করতেন বিনা বেতনে। এজন্য নিরন্তর যুদ্ধ করে যেতে হতো রোকেয়াকে। নিজের সমস্ত সম্বল তিনি ব্যয় করেছিলেন এই স্কুলের পেছনে। তবু এর মধ্যেই স্কুল চালু হওয়ার শুরুর দিকেই নেমে এলো এক বিশাল বিপর্যয়। কলকাতার বার্মা ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গিয়ে সাখাওয়াতের রেখে যাওয়া স্কুলের জন্য অনুদানের টাকাসহ রোকেয়াকে মোট তিরিশ হাজার টাকা হারাতে হয়। ফরিদপুরের কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের কাছে রক্ষিত টাকাও রোকেয়া কোনো দিন ফেরত পাননি।
চলার পথে এত বাধার পরও রোকেয়া দমে যাননি। স্কুল প্রতিষ্ঠার এক বছর পর, ১৯১২ সাল থেকে অনেক চেষ্টার করে ৭১ টাকার সরকারি অনুদান পায় স্কুল। রেঙ্গুন থেকে এক ব্যক্তির পাঠানো সাতাশ টাকার অনুদান পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন বেগম রোকেয়া। সমাজের ধনী ও সচেতন শ্রেণীর পাঠানো অনুদান স্কুল চালানোর কাজে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রায় তিন বছর পর সরকারি অনুদান বেড়ে হলো ৪৪৮ টাকা। এরই মধ্যে ছাত্রী ও ক্লাস সংখ্যা বেড়ে গেলে দুবার স্থান পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত স্কুলটিকে নিয়ে আনা হলো ৮৬/এ লোয়ার সার্কুলার রোডের একটি দ্বিতল বাড়িতে। ১৯১৫ সালে মাত্র ৫টি ক্লাস নিয়ে স্কুলটি প্রাথমিক পর্যায়ে উন্নীত হলো। রোকেয়ার অনেক চেষ্টায় শিক্ষার মাধ্যম উর্দু থেকে ইংরেজি করা হলো। একসময় স্কুলটি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষণোপোযোগী হয়। একপর্যায়ে স্কুলের ফান্ড শূন্য হলে তিনি বিত্তবানদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে স্কুল টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ ব্যাপারে রোকেয়ার হিতৈষীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন খান বাহাদুর তসাদ্দক আহমেদ।
সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গালর্স স্কুলের প্রথম ছাত্রীদের নাম ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকা দরকার। কেননা, একটা যুগের পরিবর্তনে এরাই এগিয়ে এসেছিলেন। ঐতিহাসিক সেই ছাত্রীদের নাম ও পিতার নাম যথাক্রমে -১) আখতারুন্নেছা- সৈয়দ আহাম্মদ আলী, ২) জোহরা- সৈয়দ আহাম্মদ আলী, ৩) মোনা- মাওলানা মোহাম্মদ আলী, ৪) রাজিয়া খাতুন- আবদুর রব, ৫) জানি বেগম- আবদুল ওহাব, ৬) সৈয়দা কানিজ ফাতেমা- সৈয়দ আবদুস সালেক, ৭) সৈয়দা সাকিনা- সৈয়দ আবদুস সালেক, অষ্টম ছাত্রীর পরিচয় পাওয়া যায়নি।
রোকেয়ার স্বপ্ন ছিল নারীদেরকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। এরই জন্য তিনি ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ‘আঞ্জুমান খাওয়াতীনে ইসলাম’ নামক মহিলা সংগঠন সে সময় কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৯ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি ৮ নম্বর রিপন স্ট্রিটে রোকেয়ার উদ্যোগে সারা ভারত মুসলমান মহিলা সম্মেলন হয়। প্রায় ছয়শ’ মুসলমান মহিলার উপস্থিতিতে তাঁর আহ্বানে স্কুল স্থাপন ও নারী ভোটাধিকারের সমর্থনে মুসলমান সমাজে সাড়া জাগে। তখন ইংলান্ডেও মহিলাদের ভোটাধিকার ছিলনা। নারী ভোটাধিকার দাবীতে কবি কামিনী রায় সভানেত্রী,যুগ্ম সম্পাদিকা রোকেয়া অনুগামিনী সাকিনা সুলতানা মুয়ায়েদজাদা ফারুকী M.A,B.L, কলকাতা হাইকোর্টে প্রথম মুসলমান মহিলা আইনজীবী। থিওসফিষ্ট মারগারেট কাজিন্স ছিলেন এই নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের প্রবক্তা। নিখিলবঙ্গ মুসলমান মহিলা সমিতির সাথে রোকেয়ার সংশ্লিষ্টতায় বস্তিতে বস্তিতে মহিলা ও শিশুদের জন্য স্কুল স্থাপন। মুসলমান মেয়ে, প্রথাবঞ্চিত স্বশিক্ষিতদের জন্যও প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের নিরন্তর দাবী করেছেন তিনি। প্রেসিডেন্সী ও বর্ধমান ডিভিশনের স্কুল ইন্সপেকট্রেস হৃদয়বালা বসু (হামিদা মোমিন) তাঁর দাবীর সমর্থনে সরকারকে নিত্য সচেতন করতেন।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষার নিগুঢ় অর্থ বুঝেছিলেন রোকেয়া, তাই তো শিক্ষাকে তিনি নিজের ভাষায় বলে গেছেন- “শিক্ষার অর্থ কোনো সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষের অন্ধ অনুকরণ নহে। ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা দিয়াছেন, সেই ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা। আমি কেবলমাত্র ‘পাশ করা বিদ্যা’কে প্রকৃত শিক্ষা বলি না।” এই উপলব্ধির কারণে তিনি শুধু স্কুল ও মহিলা সংগঠন তৈরির মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বেগম রোকেয়া সে আমলে ছিলেন একজন নামকরা কবি ও সাহিত্যিক। মিসেস আর এস হোসেন নামে সেকালের বিখ্যাত পত্রপত্রিকায় তিনি অসংখ্য কবিতা, উপন্যাস ও নারীদের জন্য সমাজ সচেতনমূলক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে অভিহিত বেগম রোকেয়ার (১৮৮০-১৯৩২ খ্রি.) সাহিত্য জগতে আবিভার্ব ঘটে বিশ শতকের প্রারম্ভে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ‘নব প্রভা’ পত্রিকায় ‘পিপাসা’ শীষর্ক রচনার মাধ্যমে সাহিত্য জগতে তার আবিভার্ব। বেগম রোকেয়ার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর নাম হলো,- মতিচুর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন (ইংরেজিতে লেখা), সুবেহ সাদেক, অধার্ঙ্গী, জাগো হে ভগিনী, স্ত্রী জাতির অবনতি, গৃহ ইত্যাদি। রোকেয়া সাহিত্য রচনায় বেশির ভাগ সময় লিখতেন মিসেস আর এস হোসেন। দাপ্তরিক চিঠি বা অনাত্মীয়দের কাছে চিঠি লিখতেও এই নামই স্বাক্ষর করতেন। একান্ত আপনজনদের কাছে লেখা চিঠিতে স্বাক্ষর করতেন ‘রোকেয়া বা রোকেয়া খাতুন’। রোকেয়ার সমাজ চিন্তা ও সমাজ পরিবর্তনের বিশ্বাস আধুনিক মতবাদে উজ্জীবিত। বঙ্গীয় নারীদের মধ্যে তিনিই কলম ধরেন নারীকে পণ্যকরণের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাতে। যার লেখনীতে ঘোষিত হয়েছিল মানুষ হিসেবে ভগিনীদের আত্মসম্মান ও নিজস্ব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার কথা। এ প্রসঙ্গে রোকেয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ‘সওগাত’ সম্পাদক নাসির উদ্দীন বলেছেন, ‘বেগম রোকেয়া ছিলেন তৎকালীন মুসলমান নারী সমাজের স্বাধীনতার অগ্রদূত’। ‘সওগাত’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তার উৎসাহ ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯১৮ খ্রীস্টাব্দে সওগাতের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম কবিতাটিও ছিল বেগম রোকেয়ার।
প্রগতিপন্থি হওয়া সত্ত্বেও বেগম রোকেয়া পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতেন। কারণ ছিলো তার স্কুল। যদি বেপর্দার কথা বলে মুসলমান সমাজ ফতোয়া দিয়ে তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেয়। সামাজিক পরিবেশে এরূপ কঠিন শৃঙ্খলার মধ্যে বেগম রোকেয়াকে তৎকালীন টিকে থাকতে হয়েছে। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর শীতের ভোরে ফজরের নামাজের জন্য জায়নামাজে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেদিন ভোরের আলো ফোঁটার আগেই তার মৃত্যু হয়। মাত্র ৫২ বছর বয়সে বেগম রোকেয়া ইন্তেকাল করেন। (১৮৮০-১৯৩২ খ্রি.) শোনা যায়, মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা ছিল তার হাতে গড়া স্কুল প্রাঙ্গণে কবর হবে এটি ছিল তার অন্তিম বাসনা। বলাবাহুল্য, সে আশাও তার পূরণ হয়নি। সে আমলে এক শ্রেণির রক্ষণশীল গোড়া মুসলমান সমাজ সে সময়ে তাকে তার স্কুল প্রাঙ্গণে জানাজা ও কবর দিতে বাধা দিয়েছিল। ফলে কলকাতা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে চব্বিশ পরগণার সোদপুরের শুকচার এলাকায় আত্মীয় আব্দুর রহমান খানের বাগানবাড়িতে বেগম রোকেয়ার কবর দেয়া হয়। আজ তার চিহ্ন মাত্র কোথাও বিদ্যমান নেই।
বিশ্বমানের বিচারে আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া সমাজে আজ বেগম রোকেয়া চচ্চার্র বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বেগম রোকেয়া শুধু নারীর অধিকার ও জাগতিক মুক্তির কথাই বলেননি; প্রায় এক শতাব্দী আগে সাম্প্রদায়িকতা বিহীন মুক্ত জীবনবোধ ও জীবনাচরণের উৎসাহ দিয়েছিলেন। নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ ও অগ্রদূত বেগম রোকেয়া; বাঙালি জাতির প্রেরণার অনন্য উৎস। রোকেয়া দিবসে তাঁর প্রতি জানাই গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র – যায়যায় দিন, উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্য অনলাইন মিডিয়া
পরিচিতি

হারুন-অর-রশীদ খান। জন্ম খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার খলশী গ্রামে। তিনি সরকারি বি. এল. কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। বড় ছেলে ঢাকার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করেছেন এবং ছোটছেলে এবার এইচএসসি উত্তীর্ণ হবে। কর্মজীবনে ডুমুরিয়া শহীদ স্মৃতি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় (১৯৯৪) থেকে তিনি এই কলেজে কর্মরত আছেন। কলেজটির নামকরণ তারই করা।
ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা আবৃত্তি, পথনাটিকা, গীতিআলেখ্য এবং বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। ডুমুরিয়া সদরে চারণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, উত্তরণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, অন্বেষা সাংস্কৃতিক সংসদের সাথে একজন সংগঠক হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানেও তিনি কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত আছেন। আশির দশকের শেষ দিকে তার লেখা বেশ কিছু নাটক উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মঞ্চস্থ হয়। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে দর্শকদের কাছে বেশ প্রশংসিত হয়।
সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ বরাবরই। এ কারণে অবসর পেলে লেখালেখি এবং দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করে সময় কাটানোর চেষ্টা করেন তিনি।