অরণ্যই জীবন
– অজিত কুমার কর
বাড়ির উঠোনে পথের দুপাশে যেখানেই পাবে মাটি
লাগাবে মাধবী, শিরীষ-বকুল, পুঁতবে তালের আঁঠি।
কারো মাথা উঁচু কেউবা লতানে
পরম শান্তি মাধবীবিতানে
আশ্রয় পায় কত কীট পাখি, সকলেই সুখে থাকে
কাঠবিড়ালির দাপাদাপি ডালে, খাঁটি মধু মৌচাকে।
বঞ্চিত নয় পৃথিবীতে কেউ
রুখে ম্যানগ্রোভ সাগরের ঢেউ
সুন্দরবন তাই আছে জেগে সাগরের সম্মুখে
কী নেই ওখানে অজস্র প্রাণ প্রশান্তি চোখে মুখে।
কত নদনদী কত অরণ্য
গৃহেতে মানুষ বনেতে বন্য
শান্তির নীড় ছায়া সুনিবিড় ব্যস্ত যে যার কাজে
পাখির কূজন, মানুষের হাসি, কান্নাও মাঝে মাঝে।
অরণ্য বিনা পৃথিবী শূন্য
জন্ম লভেছি এ কার পুণ্য
বন আছে বলে প্রাণের বিকাশ তা না হলে মরুভূমি
সবুজ সৃজনে নিবিষ্ট মন মায়ের চরণ চুমি।
ভরিয়ে দেব চুম্বনে
– অজিত কুমার কর
তোমার চোখের চাহনিতে জাদু
বশ মানে মনপাখি
ঘুমে জাগরণে সদাসর্বদা
তাইতো তোমারে ডাকি।
তুমি এলে নীড় ভরে জোছনায়
ছেড়ে চলে গেলে আঁধার ঘনায়
কী এমন কাজ রয়েছে তোমার
একাকী কীভাবে থাকি
তুমি ছাড়া আমি কত অসহায়
কখনও ভেবেছ তা কি?
পাশাপাশি বসে যদি কেটে যেত
নির্জনে কোনোখানে
উষ্ণ চুমুতে ভরিয়ে দিতাম
নদীবুকে সাম্পানে।
যা ভাবি তা কেন এখনও অধরা
আর কতদিনে কাটবে এ খরা
হবে কী হবে না বাসনা পূরণ
শুধু মরীচিকা টানে
আমার এ কথা বলি চুপিসারে
বাতাসের কানে-কানে।
প্রকৃতিতে দেখি নিবিড় বাঁধন
ফুলে ফুলে ওড়ে অলি
আমরা মানুষ দেখেও বুঝি না
উল্টোপথেই চলি।
খামতি দেখি না একটু কোথাও
শুধু একবার এদিকে তাকাও
এত নিস্পৃহ নেই আলোড়ন
খুঁজে ফিরি অলিগলি
লাল গোলাপের পাপড়ি উড়িয়ে
ধীর লয়ে পথ চলি।
কাজি নজরুল ইসলাম-এর জন্মদিন
– অজিত কুমার কর
আলতা-রঙে আকাশ রাঙা উঁকি মারে নতুন ভোর
মায়ের ডাকে জেগে উঠি কেটে গেল ঘুমের ঘোর।
ফুল তুলেছি গাঁথব মালা দুখু মিঞার জন্মদিন
খুশির ভেলায় ভাসছি আমি মনটা আমার আজ রঙিন।
ময়না পাখি জানিয়ে দিল তাড়াতাড়ি পরবি সাজ
গাইতে হবে স্কুলে গিয়ে ‘কে নিবি ফুল’ তোকেই আজ।
গাইবো আমি নাচবে শ্রেয়া টানবে রানি বীণায় ছড়
কবির গলায় মাল্য দিয়ে আমরা সবাই করবো গড়।
হাসবে কবি এসব দেখে মনটি হবে রঙিন তাঁর
হাজির সবাই বিদ্যালয়ে সবার সাজের কী বাহার।
কৃষ্ণচূড়া-জুঁই-করবী কল্লোলিত ডালের ’পর
সাম্যবাদের গান শোনা যায় দাও বাড়িয়ে আপন কর।
কবির গানে মলয় প্রাণে উচ্ছ্বসিত সাগর-জল
এপার-ওপার দুই বাংলায় কণ্ঠে সবার ‘চল রে চল’।
আমরা মানুষ কেবল মানুষ নয়কো হিন্দু-মুসলমান
পদ্মা-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বাঁচিয়ে রাখে সবার জান।
হৃদয়জুড়ে আছেন তিনি তাইতো ফোটে এমন গুল
ভালোবাসার পিদিম জ্বলে অকূলেও মিলবে কূল।
আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন কবিগুরুর স্নিগ্ধ মন
জাগাও ওদের ঠ্যালা দিয়ে ফিরে পাবে ঠিক চেতন।
শিকলভাঙার গান পেয়েছি টুটব প্রাচীর কারার দ্বার
বুক চিতিয়ে এগিয়ে যাবো বিলম্ব যে সয় না আর।
ঐকতানের শক্তি দেখে দুরাত্মাদের জাগবে ভয়
অন্তরেতে অগ্নিশিখা করবো আমরা বিশ্বজয়।
ইদ-সাম্যবাদ সমার্থক
– অজিত কুমার কর
কে বলেছে রোজা রাখে শুধুই মুসলমান
জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার অধিকার
অসাম্যকে দূর হটিয়ে সাম্যবাদের জয়
মানুষ বলে পরিচয় তাঁর কর্ম ব্যবহার।
কেউ যেন না অভুক্ত রয় পবিত্র এই মাসে
অন্ন-বস্ত্র-অর্থ দিয়ে ঘুচিয়ে দেব দুঃখ
এমন কথাই বলে গেছেন আল্লা সুমহান
সংযম আর সহিষ্ণুতায় লিখব তমসুক।
কত পুণ্যের ফলশ্রুতি মনুষ্যজীবন
ব্যর্থ হতে দেবো কেন বাড়িয়ে দেব হাত
প্রেম ও প্রীতির মেলবন্ধন গড়ব এই ধরায়
কাটিয়ে দেব দীনদরিদ্রের দুঃস্বপ্নের রাত।
এজন্য চাই উদারতা আমরা যে ভাই ভাই
আমি পাব, ভাই পাবে না তা কখনো হয়
দুঃখটুকু রাখব কাছে খুশির দেব ভাগ
এভাবেই তো করতে পারি সবার হৃদয় জয়।
সাঁঝ-আকাশে চাঁদ উঠেছে মেঘের ফাঁকে ওই
খুশির লহর বিশ্বজুড়ে ইদ তো মহোৎসব
ভালোবাসার প্রদীপশিখা কাটায় অন্ধকার
পরমপুরুষ সুমতি দাও তুমিই পার সব।
চাই না চলে যেতে
– অজিত কুমার কর
কে চায় বলো চলে যেতে এমন ভুবন ছেড়ে
ঘন সবুজ এই বনানী
যেন মায়ের আঁচলখানি
ছুটে বেড়াই বনে মাঠে নিয়ো না এটা কেড়ে।
বনের ভিতর পর্ণকুটির পরম সুখেই আছি
পাশেই নদী কংসাবতী
বর্ষাকালে ভয়াল অতি
নদীর জলে শস্য ফলাই নদীর জলেই বাঁচি।
সবার ওপর আছ তুমি ধরে বিশাল ছাতা
সুরক্ষা দাও ঝড়বাদলে
হারিয়ে যেতাম তা না হলে
তোমার জন্য আমার ঘরে আছে আসন পাতা।
এলেই তুমি দেখতে পাবে কীভাবে দিন কাটে
জানিয়ে বা না জানিয়ে
আস যদি জল পেরিয়ে
বুঝব, ভাবো আমায় নিয়ে রইব খেয়াঘাটে।
শ্রমের মর্যাদা
– অজিত কুমার কর
যে যার কাজে ব্যস্ত আছে বিশ্রাম কম, অষ্টপ্রহর খাটে
ফ্যাক্টরিতে বা মাঠে।
বিনিময়ে কী পায় ওরা জমিদারের ভাগা অনেক বেশি
পাইক দেখায় পেশি।
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে মুখে কুলুপ, প্রতিবাদের ভাষা
হারিয়ে গেছে, মুখ খুললেই আসবে ধেয়ে টিটকিরি তামাশা।
জুটবে শাস্তি কড়া
একজোট না হলে পরে কেমন করে ভাঙবে পরম্পরা।
বজ্রকন্ঠে আগুন জ্বালতে হবে
অবিচারের সৌধ ভাঙবে তবে।
নও তো তুমি একা
আন্দোলনের আওয়াজ তোলো, তবেই পাবে বঞ্চিতদের দেখা।
মানবে তখন বাধ্য হয়ে মিলবে তোমার পরিশ্রমের দাম
আটঘন্টার মানলে দাবি পূরবে শ্রমিক তখন মনস্কাম।
রক্তচোষা বাদুড়গুলোর দাঁত ভেঙে দাও মুষ্টিবদ্ধ হাতে
হাতিয়ার তো হাতে আছে মনোবলা আর শক্তি আছে গা-তে।
প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সাম্যবাদের সমবন্টন নীতি
তুমিও মানুষ কাটিয়ে ফেল ভীতি।
দাবিসনদ দেবে সবাই মিলে
স্বীকৃতি ঠিক পেয়ে যাবে খুশির বন্যা মঞ্জিলে মঞ্জিলে।
চুপটি করে রইলে বসে মাথার ওপর ঝুলবে ছাঁটাই-খাঁড়া
এখন থেকেই সতর্ক হও ঝাঁপিয়ে পড় পথ নেই এ-ছাড়া।
এমনি এমনি কোনোদিনও মালিকপক্ষ হবে না দরাজ
ভাবছো মাইনে বাড়িয়ে দেবে না করলেও বাড়তি সময় কাজ!
তাহলে দিন বদলে যেত, শ্রমিকশ্রেণি পেট ভরে ভাত পেত
পরম সুখে জীবন কেটে যেত।
শোষণ করা যাদের নীতি আপন স্বার্থ লাভের অংক দেখে
ব্যতিক্রমী মানুষ ক’জন একই গোত্রের প্রত্যেকে, প্রত্যেকে।
শিকার নিজে না করলেও সিংহভাগ পশুরাজের জোটে
কম খাবে না মোটে।
শিল্পক্ষেত্রে লগ্নি করে লাভের আশায় বেশিরভাগ মালিক
রক্তধারায় প্রবহমান বংশগত এ গুণ চারিত্রিক।
বিপ্লব ছাড়া পরিবর্তন হবে না এক কণা
বিষ না ঢালো ভয় দেখাতে তবুও তোলো চক্রধারি ফণা।
অমর শিল্পী বব ডিলানের গণসংগীত প্রেরণা জোগাবে
গুয়েভারার ওই বিপ্লব দশের জন্য বোঝো সবার আগে।
পিছিয়ে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ এগিয়ে চলো দৃপ্ত পদক্ষেপে
ধরতে হবে জোরসে টুঁটি চেপে।
আন্দোলনে আসবে জোয়ার চালাও চালাও সংগ্রাম দুর্বার
আঘাত হানো সময় কোথা আর।
কবি পরিচিতি

অজিত কুমার কর। জন্ম ১লা জানুয়ারি ১৯৪৬ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কিসমৎ জগন্নাথ চক গ্রামে। মাতা রাজবালা, পিতা কালিপদ। মৌরাজল অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৬২ সালে রামচন্দ্রপুর রাইসুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কুল ফাইনালে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩ তে পাঁশকুড়া বনমালী কলেজে থেকে প্রি-ইউনিভারসিটি ও ১৯৬৬ তে বিজ্ঞান বিভাগে সপ্তম স্থান অধিকার করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক হন। ১৯৬৯ এ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এস সি গণিতে প্রথম হওয়ার ছয় বছর পর ১৯৭৫ এ ওখান থেকেই পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। সিএসআইআর এর পোস্ট ডক্টরেল ফেলোশিপ পেয়ে পুল অফিসার হিসাবে দু’বছর গবেষণা করেন। ১৯৭৬ সালে জয়শ্রী মাইতি-র সাথে শুভ পরিণয়। এরপর হুগলি জেলার নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজে কুড়ি বছর অধ্যাপনার পর ২০০৫ এ গণিত বিভাগ থেকে রিডার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
তারপর প্রবেশ সাহিত্যের আঙিনায়, সহধর্মিণী ও কবি সুমনা প্রামাণিক এর অনুপ্রেরণায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ন’টি। ‘ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তাথৈ তাথৈ নাচ’, ‘পঞ্চক’ ৪খন্ড, ‘লাঞ্ছিত গোলাপ’ এবং ‘রত্নমালা’। অপ্রকাশিত ‘ছড়ার ঘড়া’, ‘ঘড়া ঘড়া ছড়া’, ‘হাঁড়ি ভরা ছড়া’ ‘এক কড়া মিঠা ছড়া’, ‘কীর্তিমান’, ‘মহৌষধ বনৌষধি’, ‘শেয়ালের উপাখ্যান’, ‘প্রেম কাননে ফুটলো ফুল’ ইত্যাদি। কবির তিনটি ই-বুক ‘নীলাঞ্জনে রঞ্জিত’, ‘কে তুমি লাবণ্যময়ী’ এবং ‘কীর্তিমান’। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কবির কবিতা, অনুগল্প ও প্রবন্ধ। বর্তমানে বাংলা-কবিতাডটকম ওয়েব ব্লগ সাইটে নিয়মিত কবিতা পোস্ট করেন। ই-ম্যাগাজিনেও কবিতা প্রকাশিত হয়। অবসর জীবন কাটছে সানন্দে সারস্বত সাধনায় পাঁশকুড়ার জয়াকুঞ্জে।