সুমিত্র দত্ত রায় – কবিতাগুচ্ছ

হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ

– সুমিত্র দত্ত রায়

কবিতা চেয়েছিলাম –
তুলির টানের মত সুক্ষ,
আলিম্পন রেখার মত সুন্দর,
কলাবউয়ের মত লাজুক,
একটা কবিতা।

খসড়া পেলাম একটা –
দৈনন্দিন জীবনের মত দুর্গম,
আন্দোলিত মনের মত তীক্ষ্ণ,
বিভীষনা মূর্ত্তির মত আরক্ত,
একটা খসড়া।

পাশাপাশি রাখলাম দুটোই –
আমার চাহিদা আর প্রাপ্তি,
অনেক কাটাকুটি, যোগ বিয়োগ করেও –
দেখলাম সরলটা জটিলতর,
ডুব দিলাম জীবনাঙ্কের ছকে।

হারিয়ে গেলাম অতল..অতলে ..
কবিতা পেলাম না।
কবিতা! কোথায় তুমি!
তুমিও কি হারিয়েছ,
আমারি মতোন ..নিস্তব্ধ..কোনো অন্ধকারে..

মাত্রা

– সুমিত্র দত্ত রায়

সব দেখা কখোনই দেখা নয়,
দেখা হলে কেউ আর একা নয়।
সব সোজা কখনোই সোজা নয়,
মাঝেমাঝে কিছু সোজা বাঁকা হয়।

সব পথ কখনো তো পথ নয়,
কিছু পথে অকারণে ঘোরা হয়।
সব কথা কখনোই কথা নয়,
কিছু কথা বুঝলেই বোঝা হয়।

সব স্বাদ কখনোই স্বাদ নয়,
বিস্বাদও জীবনেরই স্বাদ রয়।
মাত্রা যে কখন যাবে সীমানায়,
অসময়ে খোঁজা তারে বড়ো দায়।

জীবন্ত জিজ্ঞাসা

– সুমিত্র দত্ত রায়

তখন ভাদ্রমাস,
তারাদের সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে
ক্লান্ত ভোরের টিমটিমে বিজলী বাতির উপহাস
ভরা জোয়ারে গঙ্গার কলকলানি
নদীর বুকে ভাসা নৌকার ছলাত্ ছলাত্
এরই মধ্যে মনখুশিতে এগোচ্ছে কিশোরী লাবনী,
বিপিন মাস্টারের ডানপিটে মেয়ে।

বুনো গাছ, সোঁদা মাটির বাদুলে গন্ধ,
তার সাথে ভাসছে বাতাসে
শুঁয়ো কম্বলে জড়ানো শিউলি নির্যাস।
রাতের বৃষ্টি ঝরা টগর লুটোচ্ছে মাটিতে
গাছের ফুল টুকি খেলছে আলো আবছায়
এখন লাবনীর ট্রাফিক গতি,
কখনো থামা সাজি ভরতে,
কখনো চলা নতুনের সন্ধানে।

সিকি মাইল না এগোতে দৃশ্য বদল।
শ্মশান পাড়ায় মাতাল পুরুতের আস্ফালন
কালুডোমের ঝাঁকড়া চুলে অঙ্গুলী চালন
মাসী আর কুন্দের বখরা নিয়ে বচসা।
সব ছাপিয়ে শোনা গেল হরিধ্বনি
নতুন শবদেহ আসছে, ক্ষণিক নীরব।
গুটিকয়েক কঙ্কালে ভর করে শবদেহ এলো।

লাবনীর এ ঘটনা গা সহা হয়ে গেছে
পৈতৃক ভিটে তার শ্মশানের কাছে বলে।
তবু আজ
ভোরের এই অস্বচ্ছন্দ প্রেক্ষাপটে
ওর একাদশী জীবনে আলোড়ন জাগে
বিস্ফারিত দুনয়নে ফুটে ওঠে জীবন্ত জিজ্ঞাসা।

বাঁচার লড়াই

– সুমিত্র দত্ত রায়

বেচেছি গতর জঠর জ্বালায় মুছেছি চোখের জল,
বেচতে বলো না বাঁচার লড়াই ওই শেষ সম্বল।

হায়েনার মত হাসছো থেকে অন্ধকারে,
বাঁচার পথের দরজা দিচ্ছ বন্ধ করে।
কিনছো নিলামে শ্রম মজুরী
হয়ে সব একদল।
ভেবেছ কি কারো আঘাতে তুমিও
হতে পার টলোমল?
বেচতে বলো না বাঁচার লড়াই ওই শেষ সম্বল।

ঘর ফাটানো বট-অশথের মতোই জেনো,
বাড়ছি আমরা সামনে রেখে লড়াই কোনো।

বাড়ছি আমরা থেকে কোন অন্তরালে,
কিস্তি মাতের আশায় বসে দাবার চালে।
বেচিনিতো তাই শেষ হাতিয়ার
রক্তিম উজ্জল,
শেষের লড়াই লড়তে চলেছি
একতাই সব বল।
বেচতে বলো না বাঁচার লড়াই ওই শেষ সম্বল।

সেই মেয়েটা

– সুমিত্র দত্ত রায়

সেই মেয়েটা
তখনো মনে খেলতেছিল,
যে মেয়েটার
পুতুল খেলা ভাবিয়েছিল,
যে মেয়েটার
আধোবুলি মন ভরিয়েছিল,
সে মেয়েটাই
তখনো মনে খেলতেছিল।

সেই মেয়েটা
এখনো মনে সজীব আছে,
যে মেয়েটার
চোখের চাওয়াতে ভুবন নাচে,
যে মেয়েটার
হাত ইশারায় সবাই কাছে,
সে মেয়েটাই
এখন মনে সজীব আছে।

সেই মেয়েটা
তবুও মনেই ঘুমিয়ে যাবে,
যখন মেয়ে
সমাজ জ্বালায় মন হারাবে,
যখন মেয়ে
হাজার সুখেও দুঃখ পাবে,
সে মেয়েটাই
মনের গভীরে ঘুমিয়ে যাবে।

ছিলো …আছে …নেই …


কবি পরিচিতি

সুমিত্র দত্ত রায় কবির ছদ্মনাম। প্রকৃত নাম সংকেত চট্টোপাধ্যায়।

আমি ছেলেবেলা থে‌কে ভাগীরথী কূলে বড় হয়েছি। আমার একাধিক লেখার প্রেরণায় গঙ্গার ভুমিকা অনেক। ওখানেই দেখেছি সূর্যাস্ত বা তৎকালীন মেঘরঞ্জনী। আদি বাড়ির কথা দিদির চোখে দেখা। বরিশালের শোলক গ্রামেই পিতৃভূমি ও বাটাজোরে মাতুলালয় ছিল। পিতা ঈশ্বর যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাতা ঈশ্বর বিজনবালা দেবী। পারিবারিক জীবনে স্ত্রী রুমা চট্টোপাধ্যায় আর এক কন্যা সপ্তদ্বীপা চট্টোপাধ্যায়। ভাই নেই। দুই দিদি, গীতা মুখার্জী আর অঞ্জনা মুখার্জি। পিতা যোগেশচন্দ্র ছিলেন দেশপ্রেমিক। বরিশাল হতে বন্দী হয়ে দমদম সেন্ট্রাল জেলে বদলি হন। তাঁদের রক্তে কিছুটা দুঃসাহসী আমিও ছিলাম। কিন্তু কবিতার জগত আমার নিজস্ব মনে হত সেই দশবছর বয়সেই। আবৃত্তি, গান, ছবি আঁকা আমার খুবই পছন্দসই ছিলো। চাকুরিজীবী ছিলাম। এলাহাবাদ ব্যাংকে আধিকারিক। বদলির চাকরি। তাই ২০১২ সালে স্বেচ্ছায় অবসরের পর বাংলা কবিতা ডটকমে লেখা শুরু,  আমার কন্যাপ্রতিম সোমালীর হাত ধরে। আর পিছু ফিরে তাকাই নি, এখন ওটাই ধ্যান জ্ঞান।