আমার ছোটবেলা ও স্কুল-জীবন – ৪
– দীপক রায়
আমার ছেলেবেলার কয়েকটা বিষয়, যেগুলো আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, আমাকে চুড়ান্তভাবে নস্টালজিক করে তোলে! মালগাজীর হাট, হাটখোলায় প্রতি বছর চৈত্র মাসের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত মেলা, মেলায় ঘোড়দৌড়, হলদিবুনিয়া দক্ষিণ পাড়ার বাসন্তী পূজা, ঘরামী পুকুর পাড়ে অনুষ্ঠিত শ্রীশ্রী রাস পূর্ণিমার পূজা ও মেলা, সাপ্তাহিক রোববারে বসা চিলার হাট ইত্যাদি। এছাড়া চটের হাট আর বাজুয়ার হাটে অনিয়মিতভাবে যাওয়া আরও দু’টি আকর্ষণীয় স্থান।
মালগাজীর হাট, যা আমাদের বাড়ী থেকে মাত্র সিকি কি.মি. দূরে অবস্থিত। প্রতি সপ্তায় সোম ও বৃহস্পতি বার এ হাট বসতো। এটা ছিলো অতি সাধারণ একটা হাট। ছোট কয়েকটি দোচালা ঘরে কিছু মুদি দোকান বসতো। ক্ষুদ্র পরিসরে দু’একটা মিষ্টির দোকান; যেমন চাঁদপাইয়ের কালার দোকান, আর অনেক আগে বসতো সাতঘরিয়ার এক ভদ্রলোকের মিষ্টির দোকান। এ দুটোই ছিলো অস্থায়ী দোকান। স্থায়ী দোকান অনেক কাল আগে দু’ একটা ছিলো। ছিলো চায়ের দোকানও। কয়েটা কাঠবাদাম গাছ আর ছিলো দু’টো বট গাছ। একটা ছিলো খুব বড় আর পুরনো, হাটখোলার উত্তর প্রান্তে। অন্যটা দক্ষিণ প্রান্তে ধানের জমি লাগোয়া। এরও দক্ষিণে ছিলো টিনের চালে তৈরি কালী মন্দির একটা ছোট বট গাছের তলায়। আমার স্মৃতিতে এ সব খুব স্পষ্ট। হাটে বসতো সীমিত আকারে কিছু চীনা বাদাম, গ্রাম্য ফল, সবজি, চাল, গুড়, আখ, মাছ, খাতা-কাগজ, কলম-পেন্সিল, চুড়ি-ফিতা ইত্যাদির দোকান। বিশেষ রকমের মাংসও পাওয়া যেতো নিয়মিত।
কোনো দরকার নেই হাটে, তবুও চলে যেতাম সকাল সকাল হাফ প্যান্ট ও স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে। হাট বসতো বিকালের পড়ন্ত বেলায়। সন্ধ্যা হতে না হতেই শেষ হতো। বড় জোর চার পয়সার বাদাম কিনে খেতাম। পরবর্তীতে একটু বড় হলে প্রাইমারী স্কুলের সহপাঠীদের সাথে ঘোরাঘুরিও করতাম অবস্থা বুঝে। বাবার মৃত্যু হয়েছিল রাইয়টের আগে। অর্থনৈতিক ভাবে চুড়ান্ত পর্যায়ের অসচ্ছল ছিলাম আমরা। মানে নগদ পয়সার ক্ষেত্রে। তাই হাটে-মেলায় সচ্ছল ধনী সহপাঠীদের এড়িয়ে চলতাম। তবে তারা কেউ কেউ আমার প্রতি সীমিত পর্যায়ে আগ্রহ প্রদর্শন করতে চাইতো মোটামুটি এক ধরনের ভালো ছাত্র হওয়ার কারণে।
মালগাজী প্রাইমারী স্কুলে আমার হাজারো স্মৃতি! এসব স্মৃতি খুঁজতে গিয়ে চোখের জল রাখতে পারি না। রবিন, সুনীল, হরিপদ, অশোক, সমর, সাহেব,বিধান, মুকুল, মিনা, ঝর্ণা, মঞ্জু, লেখা, বকুল, সুকান্ত, রুনু, নীলিমা, বিজলী; আরও যে কতো নাম! আজ এতো বছর পর সবার নাম মনে না থাকলেও তাদের স্মৃতি মন থেকে মুছে যায় নি, যাবেও না আমৃত্যু। এ সময় আমাদের স্কুলে দূর থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা আসতো। হলদিবুনিয়, কাইনমারী, শেলাবুনিয়া, সাতঘরিয়া, ঘোলের ডাঙ্গা থেকে আসতো তারা বর্ষার দিনে জল-কাদায় ভরা রাস্তা ভেঙ্গে। আমাদের শিক্ষকদের আজ আর কেউ বেঁচে নেই। তাদের কথা মনে হলে চোখের জল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মাঝে মাঝে এলাকার শিক্ষিত যুবকরা আসতেন স্কুলে। তাঁরা এ স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্র। তাঁরা সবচেয়ে উপরের ক্লাস হিসাবে ৫ম শ্রেণীতে ক্লাস দিতেন সখ করে। প্রধান শিক্ষক মহাশয় খুশী হতেন এতে। তাঁর ক্লাসটাই হয়তো দিতেন। একবার হেড মাষ্টার মহোদয়ের সঙ্গে একজন খুব সুদর্শন যুবক ঢুকলেন আমাদের পঞ্চম শ্রেণীতে। তাঁকে আমি আগে কখনও দেখিনি তখন। পরনে স্মার্ট হাফ স্লিভ শার্ট আর প্যান্ট। হেড স্যার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন: ইনি গিলাতলা কলেজের প্রফেসর, এম, কম, পাশ। আমি অবাক চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম! এতো কম বয়েসী কোন শিক্ষককেই আগে কোনো দিন দেখি নি; আর ইনি হলেন কলেজের প্রফেসর! কী মিষ্টি চেহারা! তিনি আমার এলাকার বিশেষ একজন মানুষ। তিনি মোংলা সরকারী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত। যাঁর নাম এলাকার সবাই জানেন। অধ্যাপক সুনীল কুমার বিশ্বাস।
মনে পড়ে, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম রামপালের পেড়িখালী স্কুলে। আমার সাথে আমার স্কুল থেকে গিয়েছিলো মিনা (কাবেরী) ও বকুল। ছেলেদের মধ্য থেকে আমি একা। আমাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়ার মতো দায়িত্বশীল লোক কেউ আমার পরিবারে ছিলো না, ছিলো দায়িত্বহীন লোক। আমার শিক্ষক ঠাকুর মাষ্টার মশায় আমাকে নিজ দায়িত্বে নিয়ে যান পেড়িখালীতে। ওখানে বড় পুকুরের কাছে ঠাকুর মাষ্টার মশায়ের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ীতে আমাদের দু’জনের থাকার ব্যবস্থা হয়। তখন তো হাঁটা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। সকাল-বিকাল পরীক্ষা হতো। পেড়িখালি স্কুলের উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একটা টিনের ঘরে আমার সিট পড়েছিলো, ঘরের মধ্যিখানে। একটা পরীক্ষা শেষ হলে ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা, মা বা অন্যান্য অভিভাবকরা হুমড়ি খেয়ে পড়তো ডাব, কলা আর বিস্কুট নিয়ে। আমি এসব দেখে মজা পেতাম। আমার জন্য ঠাকুর মাষ্টার মশায় একটু দূরে অপেক্ষায় থাকতেন। আমার সহপাঠীদের সাথে আমার কখনও পরীক্ষা কেন্দ্রে দেখা হয় নি। শুধু মনে আছে সেন্ট পলস্ স্কুল থেকে যাওয়া আমার পূর্ব পরিচিত একজন অংক পীক্ষার পর আমার কাছে সরলের উত্তরটা জানতে চেয়েছিলো। ছেলেটি এখন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত।
আজ এতো বছর পরও (যে বাড়ীর বারান্দায় আশ্রয় পেয়ে উপকৃত হয়েছিলাম) সে বাড়ীর স্মৃতি আমার মানস-পটে উজ্জ্বল। পেড়িখালিতে যাওয়ার সুযোগ হলে আমি ভাবি ওই বাড়ীটার খোঁজ করবো। তবে মিনার মামা বাড়ীতে একদিন সকালে মাংস ভাত খেয়েছিলাম মিনার আমন্ত্রণে। স্যারও (অমর বাবু, আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, তবে সে সময় তিনি আমার শিক্ষক হন নি) ওই বাড়ীতে ছিলেন। আমি লাজুক ছিলাম বলে পিতা ও কন্যা আমাকে নিয়ে অনেক মজার কথা বলেছিলেন।
১৯৬৯ সালের গণ অভ্যূত্থানের প্রভাব আমাদের অঞ্চলেও এসে পড়ে। এক রাস পূর্ণিমার মেলার সময় বিকাল বেলায় হঠাৎ দেখলাম শত শত লোকের এক জঙ্গী মিছিল মোংলার দিক থেকে এসে হলদিবুনিয়ার উত্তর পাড়ার সরকারী পুকুরের উত্তর পাড়ে এসে থামলো, আর সেখানে এক অনির্ধারিত মিটিং অনুষ্ঠিত হলো। মিটিং এর পরে আমরা ক’জন সেখানে গিয়ে দেখলাম মাঠে যে আগাছা ধরনের প্লান্ট ছিলো, সেগুলো ভেঙে চুরে একদম পরিষ্কার। কারণ কয়েক শো লোক ওখানটায় বসে পড়ে মিটিং এর সময়।
এর পর ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে এক ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস হয়। এতে বিভিন্ন দ্বীপসহ উপকূল অঞ্চলের অসংখ্য লোকের মৃত্যু হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বা কোনো মন্ত্রী এসময় এদেশের মানুষের জন্য সহানুভূতি জানাতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসে নি। মোংলা অঞ্চলের সমস্ত রোপা আমন ধানের মাঠ আর বিল জলের নিচে চলে যায়। আমার বেশ মনে পড়ে চারিদিকে সাগরের মতো এতো জল দেখে আমার এক ধরনের আনন্দ বোধ হচ্ছিলো। বড়রা দুশ্চিন্তা করছিলো। এক সন্ধ্যায় হলদিবুনিয়ার মামা বাড়ী থেকে দাদু তার নৌকা নিয়ে বিল পাড়ি দিয়ে আমাদের নিতে আসলো। আমরা বাড়ী ফেলে সবাই মামা বাড়ী গেলাম। বিল পাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় আমার সে কী আনন্দ! বিলের কোথাও রোপা ধানের গাছ দেখা যাচ্ছিলো না। যেন বিশাল এক সাগর! সন্ধ্যার পর মামা বাড়ীতে গেলাম। মনে আছে নৌকাটা রাতে উঠানে ওঠা জলে বেঁধে রাখা হলো যদি রাতে ঘর বাড়ী সব ডুবে যায় এই আশঙ্খায়। রাতে কেউ ঘুমাতে পারলাম না বা ঘুমাতে দেয়া হলো না। ওই সময় জোছনা রাত ছিলো। মামা বাড়ীর বারান্দা থেকে দেখলাম হলদিবুনিয়া আর ঘোলের ডাঙ্গার মাঝখানের রাস্তা অতিক্রম করে জোয়ারের জল জল-প্রপাতের মতো এধারে এসে পড়ছে। সবাই ভয়ে অস্থির ছিলো, এখনই হয়তো সবাই এই জলে ভেসে যাবো!
কিন্তু আমরা ছিলাম, ভেসে যাই নি, এখনও বেঁচে আছি। এর পর কতো ঝড় ঝাপটা গেলো, দুর্যোগ, জীবন সংশয়ের মুখোমুখী হলাম কতো বার! তবুও টিকে আছি, বেঁচে আছি নিরন্তন সংগ্রাম করে, এক রকম যুদ্ধ করে! সেই শিশু কাল থেকে এ জীবন কাল পর্যন্ত কতো কথাইতো জমে আছে স্মৃতি নামক নির্লজ্জ বাক্সে। কেনো ভুলতে পারি না জানি না। কতো বার চেষ্টা করেছি ভুলতে। পারি নি, বরং আরও স্পষ্টতর হয়েছে মাথার মধ্যে দু’চোখের উপরখানটা জুড়ে!
আসলো ‘৭০ এর সাধারণ নির্বাচন। কট্টোর পাকিস্তান পন্থীদেরও দেখলাম আওয়ামী লীগের পতাকা তলে। কী অভূতপূর্ব এক একতার জোয়ার সৃষ্টি হলো এ উপমহাদেশে পূর্ব বাংলা নামক ছোট্ট এই ভূ-খন্ডে ইতিহাসে প্রথম বারের মতো! (চলবে)
লেখক পরিচিতি

দীপক রায় – পূর্ণ নাম: দীপক কুমার রায়। জন্ম এস এস সি সার্টিফিকেট অনুযায়ী ৭ই জানুয়ারী, ১৯৬৩। বৃহত্তর খুলনার অন্তর্গত বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলায় মালগাজী গ্রামে। বাবা স্বর্গীয় শ্রী ধনঞ্জয় রায় এবং মা শ্রীমতি অমলা রায়। মোংলার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয় ও খুলনার দৌলপুরে সরকারী ব্রজলাল কলেজ থেকে যথাক্রমে এস এস সি এবং এইচ এস সি পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন।
চাকরি জীবন শুরু ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর, ঢাকায় বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের জন্য বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার একটা স্কুলে সিনিয়র ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার হিসাবে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে ওই চাকরি থেকে ইস্তাফা দিয়ে বর্তমান পর্যন্ত স্বনিযুক্ত প্রশিক্ষক হিসাবে বিদেশী শিক্ষার্থীদেরকে বাংলা ভাষার শিক্ষাদানের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
ব্যক্তি জীবনে বিবাহিত। এক ছেলেও এক মেয়ের বাবা। ছেলে সুদীপ্ত রায় ঢাকার একটি বৃহত্তর বেসরকারী হাসপাতালে রেজিস্ট্রার ডাক্তার হিসাবে কর্মরত। মেয়ে শর্মিষ্ঠা রায় পরিবেশ বিজ্ঞানে সম্মান সহ সম্প্রতি স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দিয়েছে।
বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিতে গভীর ব্যুৎপত্তি ও অনুরাগসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী দীপক রায়। তাই কাজের ফাঁকে নিজের সন্তুষ্টির জন্য লেখা-লেখি নিয়ে সময় পার করেন। ফেসবুকে জীবন ও বাস্তবতা নিয়ে কবিতা লিখে থাকেন প্রতিদিনই, নিয়মিত। গান শোনা তাঁর অন্যতম প্রধান শখ। বিশেষতঃ রাগ প্রধান গান – এ উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি তাঁর ব্যপক আগ্রহ। যখনই অবসর পান গান শুনে সময় কাটানোই তার নিয়মিত অভ্যাস।